
যে কমন ভুল গুলো রুকইয়াহতে সফল হতে দেয়না।
April 18, 2026পুরুষের জীবনে সিহরু তা’তিলির রিযিক
রিযিকে বাধার যাদু কী? এবং কিভাবে ইহার প্রভাব পতিত হয় এবং রিযিক বৃদ্ধি করার পদ্ধতি।
সিহরু তা’তিলির রিযিক এমন একটি যাদু, যার মাধ্যমে একজন মানুষের জীবিকার পথ সংকুচিত করে দেওয়া হয়। এটি সরাসরি দারিদ্র্য তৈরি করার জন্য নয়, বরং এমনভাবে বাধা সৃষ্টি করা হয় যাতে ব্যক্তি চেষ্টার পরেও সফল হতে না পারে, তার উপার্জনের পথ বারবার বন্ধ হয়ে যায় এবং জীবনে স্থিরতা আসতে না পারে। বিশেষ করে পুরুষের জীবনে এই যাদুর প্রভাব অনেক গভীর হয়। কারণ পরিবার, দায়িত্ব এবং রিযিকের চাপ সাধারণত পুরুষের উপরই বেশি থাকে। ফলে রিযিকে বাধা সৃষ্টি হলে তা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো পরিবারের জীবনে অস্থিরতা তৈরি করে।
যাদুটি কিভাবে কাজ করে?
সিহরু তা’তিলির রিযিক সাধারণত খাদেম জিনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই জিন ব্যক্তি ও তার জীবিকার উৎসের মাঝে একটি অদৃশ্য বাধা তৈরি করে।
এই পুরো যাদুর প্রক্রিয়াটি কয়েকভাবে ঘটে:
প্রথমত, ব্যক্তির কর্মক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া হয়। সে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় বা সুযোগ চিনতে ব্যর্থ হয়।
দ্বিতীয়ত, কাজের পরিবেশে সমস্যা তৈরি করা হয়। হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া, ব্যবসায় অকারণ ক্ষতি, ক্লায়েন্ট বা অংশীদারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়া এগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখা যায়।
তৃতীয়ত, রিযিকের সুযোগ আসলেও তা স্থায়ী হয় না। নতুন কাজ শুরু হলেও কিছুদিন পর তা ভেঙে পড়ে বা অজানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়।
চতুর্থত, ব্যক্তি নিজেই ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়ে। তার ভেতরে অলসতা, ভয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং উদ্যোগহীনতা তৈরি হয়, যা যাদুর প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে।
শরীর ও মনের উপর যেভাবে প্রভাব পতিত হয়।
এই যাদু শুধু বাহ্যিক জীবনে নয়, বরং শরীর ও মানসিক অবস্থার উপরও বেশ প্রভাব ফেলে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মাথা ভারী লাগা, চিন্তা পরিষ্কার না হওয়া ,অকারণ ক্লান্তি ও শক্তিহীনতা । কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, হঠাৎ উদ্বেগ ও ভয় তৈরি হওয়া রাতের ঘুমে অস্থিরতা।
এই অবস্থায় ব্যক্তি বুঝতে পারে কিছু একটা সমস্যা আছে, কিন্তু সঠিক কারণ নির্ণয় করতে পারে না।
পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে প্রভাব
আমরা রুকইয়াহর অভিজ্ঞতায় দেখেছি – পুরুষ রিযিকে বাধা সৃষ্টি হলে, এর প্রভাব সরাসরি দাম্পত্য জীবনে পতিত হয়।
স্বামী যখন বারবার ব্যর্থ হয়, তখন তার ভেতরে হতাশা জন্ম নেয়। সে নিজেকে অযোগ্য মনে করতে শুরু করে। অন্যদিকে অনেক স্ত্রী বা পরিবারের পক্ষ থেকেও চাপ তৈরি হয়। এতে করে ধীরে ধীরে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব, রাগ, অভিমান এবং অশান্তি তৈরি হয়।
অনেক সময় এই অবস্থাই পরবর্তীতে সিহরুত তাফরিক অর্থাৎ বিচ্ছেদের যাদুকে আরও সহজে কার্যকর করে তোলে।
এই যাদুর উপকরণ গুলো।
এই ধরনের যাদুতে সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট বস্তু ব্যবহার করা হয়: সংক্ষেপে যদি বলি
তলাসিম লেখা কাগজ তাবিজ বা গিঁট দেওয়া সুতা ব্যক্তিগত বস্তু যেমন কাপড়, চুল , দাড়ি, মাটি, ধুলা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত কিছু বস্তু পানি বা খাবারের মাধ্যমে প্রভাব,এই বস্তুগুলো ব্যবহার করে ব্যক্তির রিযিকের সাথে একটি অদৃশ্য সংযোগ তৈরি করা হয়।
করণীয় ও প্রতিকার
রিজিক একমাত্র আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। দুনিয়ার কোনো মানুষ কারো রিজিক কমাতে বা বাড়াতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য তার রিজিক নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তা সময়মতো তার কাছেই পৌঁছাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا
পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিজিক আল্লাহর দায়িত্বে নয়।
সূরা হূদ ১১:৬
মানুষ যখন অন্যের রিজিক দেখে হিংসা করে, তখন সে মূলত আল্লাহর ফায়সালার উপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। কারো কাছে যা আছে, তা তার জন্য নির্ধারিত ছিল। আর আপনার জন্য যা নির্ধারিত, তা কেউ নিতে পারবে না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
إِنَّ رُوحَ الْقُدُسِ نَفَثَ فِي رُوعِي أَنَّهُ لَنْ تَمُوتَ نَفْسٌ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ رِزْقَهَا
রূহুল কুদস আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছেন যে, কোনো প্রাণ তার পূর্ণ রিজিক গ্রহণ না করা পর্যন্ত মৃত্যু বরণ করবে না
সুনান ইবনে মাজাহ ২১৪৪, সহিহ
অনেকে মনে করে হারাম পথে গেলে দ্রুত রিজিক আসে। এটি এক মারাত্মক ভুল ধারণা। হারাম উপার্জন রিজিক বাড়ায় না, বরং বরকত ধ্বংস করে দেয় এবং দুআ কবুল হওয়া থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না
সহিহ মুসলিম ১০১৫
গুনাহ মানুষকে শুধু আখিরাতেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, দুনিয়াতেও রিজিক সংকুচিত করে দেয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
إِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
নিশ্চয় মানুষ তার করা গুনাহের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়
মুসনাদ আহমাদ ২২৩৮৬, হাসান
যে আমল গুলো করলে আপনার রিযিক বৃদ্ধি হবে।
১. গুরুত্ব আর মহব্বত নিয়ে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে পারি।
২. নিয়মিত সালাতুল হাজত পড়তে পারি।
৩. বড় কোনও গুনাহের বদ অভ্যাস থাকলে তাওবা করা জরুরী।
৪) বেশি বেশি ইস্তেগফার করতে পারি।
৫) মা-বাবার প্রতি সাদাচার করা জরুরী। নিয়মিত আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর রাখতে পারি।
৬) হালাল রিজিকের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারি।
৭) নিয়মিত এই দোয়া করতে পারি,
رَبِّ إِنِّی لِمَاۤ أَنزَلۡتَ إِلَیَّ مِنۡ خَیۡرࣲ فَقِیرࣱ
হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য যে রিযিক নাযিল করেছেন, আমি তার খুব মুখাপেক্ষী (কাসাস: ২৪)।
অতপর এই দুআটি – পাঠ করুন।
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
হে আল্লাহ, আপনার হালাল দিয়ে আমাকে হারাম থেকে যথেষ্ট করে দিন এবং আপনার অনুগ্রহ দিয়ে আপন ব্যতীত অন্যদের থেকে আমাকে মুখাপেক্ষীহীন করুন
তিরমিজি ৩৫৬৩, হাসান
৮. এছাড়া ওজুর পরে পঠিত দোয়াটির মধ্যেও রিজিকে বরকতের প্রার্থনা আছে,
اللَّهُمَّ اغْفِرْلِيْ ذَنْبِيْ وَوَسِّعْ لِيْ فِيْ دَارِيْ وَباَرِكْ لِيْ فِيْ رِزْقِيْ
আল্লাহুম্মাগফিরলী যাম্বী ওয়া ওয়াসসিলী ফী দারী ওয়া বারিক লী ফী রিজকী।
ইয়া আল্লাহ, আমার গুনাহ মাফ করে দিন। আমার বসতবাড়িতে প্রশস্ততা দান করুন। আমার রিজিকে বরকত দান করুন (মুসনাদ: ২/৪৫০৬)।
৯. দুই সিজদার মাঝেও পেয়ারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিজিকের দোয়া করেছেন,
اللهُمَّ اغْفِرْ لِيْ وَارْحَمْنِيْ وَاهْدِنِيْ وَاجْبُرْنِيْ وَعَافِنِيْ وَارْزُقْنِيْ وَارْفَعْنِيْ
আল্লাহুম্মাগফিরলী ওয়ার-হামনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়া আফিনী ওয়ারযুকনী ওয়ারফা’নী।
ইয়া আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দিন। আমার প্রতি দয়া করুন। আমাকে হেদায়াত দান করে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমার সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন। আমাকে সার্বিক নিরাপত্তা-সুস্থ্যতা দান করুন। আমাকে রিজিক দান করুন। আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন (আবু দাউদ: ৮৫)
১০ / প্রতিদিন মাগরীবের পর সুরা ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করা বা শোনা।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়া তেলাওয়াত করবে তাকে কখনো দরিদ্রতা স্পর্শ করবে না।
(বাইহাকি: শুআবুল ঈমান-২৪৯৮)
রিজিক কোনো মানুষের হাতে নয়। সম্মান, অপমান, প্রাচুর্য ও অভাব সবই আল্লাহর পরীক্ষা। যে ব্যক্তি হালাল পথে অটল থাকে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তার জন্য রিজিকের মধ্যে বরকত দান করেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল রিজিকের উপর সন্তুষ্ট থাকার এবং কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখাটি ভালো লাগলে সাদকায়ে জারিয়ার নিয়তে লেখাটি শেয়ার করতে পারেন।




